মো. মমিন
উদ্দীন
ভালো-মন্দের যেহেতু কোন প্রমানিত সংজ্ঞা নেই, তাই কোনটি ভালো আর কোনটি মন্দ তা নির্ধারণ করা কঠিন। এক সমাজে যা ভালো অন্য সমাজে তা মন্দও হতে পারে। আবার একজনের কাছে যা সুন্দর বা সঠিক অন্যজনের কাছে তা খুবই অসুন্দর বা অন্যায্য। সুতরাং ভালো-মন্দের নির্দিষ্ট কোন রূপ রেখা নেই। এটি নির্ভর করে সম্পূর্ণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির উপর। এক্ষেত্রে কোন কিছু ভালো কি মন্দ তা ঐ বিষয় বা বস্তুর উপর নির্ভর না করে নির্ভর করে বিষয়টি কিভাবে দেখা হচ্ছে তার উপর। আবার কোন একটি বিষয় বা বস্তু একসময় একজন ব্যক্তির কাছে ভালো মনে হলেও পরক্ষণে ঐ একই বিষয় একই ব্যক্তির কাছে মন্দ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। যখন ভালো মনে হয় তখন সে তার স্বপক্ষে শক্ত যুক্তি তুলে ধরে। আবার যখন মন্দ মনে হয় তখনও তার মতের স্বপক্ষে শক্ত যুক্তি উপস্থাপন করে। তাহলে কি সবই মনের খামখেয়ালি? মনে করলেই কোন কিছু ভালো, আবার মনে করলেই সেই একই জিনিস মন্দ? না ঠিক তা নয়। কোন কিছু ভালো বা মন্দ হিসেবে প্রতিয়মান হওয়ার পিছনে থাকে ব্যক্তি স্বার্থ©, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর ভিন্নতা।
একটি উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি পরিস্কার করা যাক। ধরা যাক আমার নিজ পরিবারের একজন পুরুষ সদস্যের বিবাহের জন্য আগে থেকেই একটি কনে পছন্দ করে রাখা হয়েছিল। মেয়েটি দেখতে লম্বা, স্বভাব চরিত্র ভালো । মুখে সব সময় একটি মিষ্টি হাসি। সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলে। এগুলিই ছিল তার প্রধান গুণ, যে কারণে তাকে কনে হিসেবে পছন্দ করা হয়েছিল। ঐ পরিবারের সাথে তখন আমাদের পরিবারের ভালো সম্পর্ক ছিল। কিন্তু হঠাৎ করে একটি বিশেষ কারণে দুই পরিবারের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে মেয়েটির সকল গুণ দোষে পরিণত হলো। বলা হলো, মেয়েটি ইন্ডিয়ান গরুর মতো লম্বা, লজ্জা-শরম কিছু নেই, মানুষের সামনে দাঁত বের করে হি হি করে হাসে। সুতরাং কোন কিছু ভালো না মন্দ তা সর্ম্পূণরূপে মানুষের স্বার্থ© এবং দৃষ্টিভঙ্গির উপর নির্ভর করে।
একেক সমাজের মানুষের বিশ্বাস-অবিশ্বাস, ভালো-মন্দের ধারণা একেক ধরনের। মানুষের আচার-আচরণ কেমন হবে সে সম্পর্কে প্রতিটি সমাজের নির্দ্রিষ্ট কিছু নিয়ম-কানুন থাকে, যা অন্য একটি সমাজ থেকে পৃথক। তাই এক সমাজে যা ভালো অন্য সমাজে তা মন্দ। ভেনিজুয়েলার গুর্খা উপজাতিদের ভালো-মন্দের ধারণা আমাদের কাছে অদ্ভুত মনে হতে পারে। আবার আমাদের ভালো-মন্দের ধারণা তাদের কাছে একইভাবে অদ্ভুত মনে হতে পারে। ফিলিস্থিনিদের স্বাধীনতা সংগ্রামকে পশ্চিমা বিশ্ব সন্ত্রাসী কার্যকালাপ বলে আখ্যায়িত করে। অথচ ফিলিস্থিনিদের কাছে এটি তাদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দোলন।
মানুষের ভালো-মন্দের ধারণা পারিবারিক এবং পারিপার্শ্বিক অবস্থার দ্বারাও প্রভাবিত। এ কারণে একই সমাজে বসবাস করেও ভালো-মন্দের ধারনায় এক পরিবার অন্য পরিবার থেকে পৃথক। এমনকি একই পরিবারের সদস্যদের ভিতরেও ভালো-মন্দের ধারণায় থাকে ভিন্নতা। মানুষে-মানুষে, সমাজে-সমাজে এবং রাষ্ট্রে-রাষ্ট্রে এই মতানৈক্যতার কারণে শুরু হয় তর্ক-বিতর্ক, বিবাদ-সংঘাত।
একই বিষয় কেন বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে? এক্ষেত্রে ফরাসী ভাষাতাত্ত্বিক ফার্দিনান ডি স্যাসুরের তত্ত্বটির সাহায্য নেওয়া যায়। স্যাসুরের মতে, meanings
are arbitrary কারণ কোন বস্তুরই নিজেস্ব অর্থ নেই। একটি বস্তুর অর্থ কি হবে তা নির্ধারণ করে মানুষ। আর মানুষের চিন্তাভাবনা নির্ধারিত হয় একটি সমাজের সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও অন্যান্য অবস্থার দ্বারা। যেহেতু একেক সমাজের সংস্কৃতি ও মুল্যবোধ একেক ধরনের, তাই মানুষের চিন্তাচেতনাও সমাজভেদে পৃথক। স্যাসুরের মতে, অর্থ গঠিত হয় signifier এবং signified এর সমন্বয়ে। signifier টি সব সময় এক থাকলেও signified হয় ভিন্ন ভিন্ন। কারণ signified টি নির্ধারণ করে মানুষ।
সময়ের সাথে সাথে মানুষের মনোজগতে পরিবর্তন আসে, পরিবর্তন আসে দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিচার বিশ্লেষণ করার ক্ষমতায়ও। তাই কোন এক বিশেষ সময়ের অনুধাবন সারা জীবন স্থায়ী হয় না। সময়ের সাথে সাথে পূর্বের অনুধাবন মিথ্যা প্রমানিত হয়, গড়ে ওঠে নতুন বিশ্বাস, নতুন অনুধাবন। আবারও কালের পরিক্রমায় পুরাতন বিশ্বাস ও অনুধাবন ভেঙ্গে গড়ে উঠতে পারে নতুন বিশ্বাস। গড়ে উঠতে পারে একই বিষয়ে অসংখ্য দ্বান্দ্বিকতাপূর্ণ নতুন অনুধাবন। এক্ষেত্রে শেষ কথা বলে কিছু নেই।
শেক্সপিয়ারের ম্যাকবেথ যতবার পড়ি ততবার নতুন করে ভাবি। পুরাতন ধারণা ভেঙ্গে নতুন ধারণার জন্ম হয়। কখনো মনে হয় ম্যাকবেথ লোভী, পাপি, বিশ্বাসঘাতক। কাপুরুষের মতো নিজের ঘরে অতিথি রাজাকে হত্যা করে সারা জাহানের অতিথি-স্বাগতিক সম্পর্ককে কলঙ্কিত করেছে। আবার কখনো মনে হয়, ম্যাকবেথ বীর, মহাবীর । স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র ভেঙ্গে নতুন এক গণতান্ত্রীক পদ্ধতির প্রবক্তা ম্যাকবেথ, যেখানে রাজা হওয়ার যোগ্যতা হবে মানুষের শিক্ষা, রাজার ঘরে জন্ম নেওয়া নয়। মনে হয়, রাজাকে নয়, ম্যাকবেথ খুন করেছে গণমানুষের অধীকারহরণকারী রাজতন্ত্রকে। ম্যাকবেথ উচ্চভিলাসী নয়, অধিকার সচেতন। ম্যাকবেথের বিদ্রোহ কোন এক রাজার বিরুদ্ধে নয়, ম্যাকবেথের বিদ্রোহ ভাগ্য লেখকের বিরুদ্ধে যে যোগ্যতম ব্যক্তিদেরও শাসক হওয়ার অধিকার থেকে বঞ্চিত রেখেছে শুধু মাত্র রাজার ঘরে জন্ম না নেওয়ার কারণে। কখনো মনে হয়, শেক্সপিয়ার ছিলেন রাজতন্ত্রের অনুসারী। রাজার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণাম কি ভয়াবহ সেটি দেখানোই ছিল তার মুল উদ্দেশ্য ম্যাকবেথ নাটক লেখার পিছনে। আবার কখনো মনে হয়, শেক্সপিয়ার ছিলেন ম্যাকবেথের মতোই পরিবর্তনে বিশ্বাসী, আর তার ম্যাকবেথ নাটকটি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে।
‡jLK: cÖfvlK, Bs‡iwR wefvM, RMbœv_ wek¦we`¨vjq, XvKv